পাইলস থেকে রক্ত পড়া

পাইলস থেকে রক্ত পড়া | Dr. Faridul Islam

পাইলস থেকে রক্ত পড়া কেন হয়?

পাইলস থেকে রক্ত পড়া পাইলস বা অর্শ রোগের একটি পরিচিত লক্ষণ। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ পাইলসের ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা যেতে পারে। সাধারণত শক্ত মল, কোষ্ঠকাঠিন্য বা মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার কারণে পাইলসের ফুলে থাকা রক্তনালিতে ঘর্ষণ ও চাপ পড়ে রক্তপাত হতে পারে।অনেকেই মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়লে এটিকে স্বাভাবিকভাবে পাইলসের সমস্যা মনে করেন। কিন্তু মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতের সব কারণ পাইলস নয়। এনাল ফিশার, পলিপ, অন্ত্রের প্রদাহ বা অন্যান্য রোগের কারণেও রক্তপাত হতে পারে। তাই বারবার রক্ত পড়লে সঠিক কারণ নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ।

পাইলস থেকে রক্ত পড়ার সাধারণ লক্ষণ

পাইলসের রক্তপাত সাধারণত কিছু নির্দিষ্টভাবে দেখা দিতে পারে। যেমন—

  • মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্ত
  • মলের গায়ে রক্ত
  • টয়লেট পেপারে রক্ত
  • মলত্যাগের পর কমোডে রক্তের ফোঁটা
  • মলত্যাগের সময় বা পরে রক্তপাত
  • কখনও মলদ্বারে গুটি বা মাংস বের হওয়ার সঙ্গে রক্তপাত

রক্তপাতের পরিমাণ ও ধরন রোগের অবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে।

পাইলসের রক্ত সাধারণত কেমন হয়?

অভ্যন্তরীণ পাইলসের ক্ষেত্রে সাধারণত উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা যেতে পারে। রক্ত মলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার পরিবর্তে মলের ওপর, টয়লেট পেপারে বা মলত্যাগের শেষে দেখা যেতে পারে।

তবে শুধু রক্তের রং দেখে রোগ নিশ্চিত করা যায় না। রক্তপাতের সঙ্গে অন্যান্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

পাইলস থেকে রক্ত পড়ার প্রধান কারণ

১. কোষ্ঠকাঠিন্য

দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে শক্ত মল বের করার সময় মলদ্বারে বেশি চাপ পড়ে। এতে পাইলসের রক্তনালিতে চাপ বেড়ে রক্তপাত হতে পারে।

২. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া

জোর করে মলত্যাগ করার অভ্যাস পাইলসের উপসর্গ বাড়াতে পারে এবং রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৩. কম আঁশযুক্ত খাবার

খাদ্যতালিকায় আঁশ কম থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। শক্ত মল পাইলসের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

৪. দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা

টয়লেটে দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং মলত্যাগের সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে চাপ দেওয়া পাইলসের সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

৫. পাইলসের উন্নত পর্যায়

অভ্যন্তরীণ পাইলস বড় হলে মলত্যাগের সময় বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে এবং ঘর্ষণের কারণে রক্তপাত হতে পারে।

পাইলস থেকে রক্ত পড়ার সঙ্গে আর কী কী লক্ষণ থাকতে পারে?

রক্তপাতের পাশাপাশি নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে—

  • মলদ্বারে গুটি
  • মলদ্বারে ফোলা
  • চুলকানি
  • জ্বালাপোড়া
  • মলদ্বারে অস্বস্তি
  • মলত্যাগের সময় ব্যথা
  • মলদ্বার দিয়ে মাংস বের হওয়া
  • মলত্যাগের পরও চাপ অনুভব করা

সব রোগীর ক্ষেত্রে সব উপসর্গ থাকবে এমন নয়।

পাইলস থেকে রক্ত পড়লে কী করবেন?

রক্তপাত হলে প্রথমে কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার রাখুন।

মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না এবং টয়লেটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকবেন না।

হালকা অস্বস্তির ক্ষেত্রে কুসুম গরম পানিতে কিছুক্ষণ বসে থাকা সাময়িক আরাম দিতে পারে।

তবে বারবার রক্তপাত হলে শুধুমাত্র ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তপাতের কারণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

পাইলস থেকে রক্ত পড়ার চিকিৎসা

চিকিৎসা নির্ভর করে পাইলসের ধরন, গ্রেড এবং রোগীর উপসর্গের ওপর।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসক পরামর্শ দিতে পারেন—

  • আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া
  • পর্যাপ্ত পানি পান
  • কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ
  • নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম
  • মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া
  • দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে না বসা

ওষুধ

রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক ব্যথা, চুলকানি বা প্রদাহ কমানোর জন্য ওষুধ দিতে পারেন। কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে মল নরম রাখার জন্যও চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে।

নিজে থেকে দীর্ঘদিন কোনো ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।

রাবার ব্যান্ড লিগেশন

নির্বাচিত অভ্যন্তরীণ পাইলসের ক্ষেত্রে Rubber Band Ligation একটি নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা পদ্ধতি। এতে পাইলসের গোড়ায় ছোট রাবার ব্যান্ড লাগিয়ে রক্ত সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়।

অন্যান্য নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা

রোগীর অবস্থার ভিত্তিতে Sclerotherapy বা অন্যান্য পদ্ধতি বিবেচনা করা হতে পারে।

লেজার চিকিৎসা

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লেজার-ভিত্তিক পাইলস চিকিৎসা উপযুক্ত হতে পারে। তবে লেজার চিকিৎসা সব ধরনের পাইলসের জন্য উপযুক্ত নয়। রোগের ধরন ও গ্রেড দেখে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

সার্জিক্যাল চিকিৎসা

বড়, জটিল বা উন্নত পর্যায়ের পাইলসের ক্ষেত্রে সার্জিক্যাল চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

পাইলস থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেলে কি চিকিৎসা দরকার?

রক্তপাত বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই পাইলস সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছে—এমন নয়। পাইলসের উপসর্গ কিছু সময়ের জন্য কমে আবার ফিরে আসতে পারে।

বিশেষ করে যদি আগে একাধিকবার রক্তপাত হয়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সমস্যার কারণ ও পাইলসের অবস্থার মূল্যায়ন করা ভালো।

পাইলসের রক্তপাত আর ফিশারের রক্তপাতের পার্থক্য

পাইলস এবং এনাল ফিশার—দুই ক্ষেত্রেই উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা যেতে পারে।

পাইলসের ক্ষেত্রে রক্তপাতের সঙ্গে গুটি, মাংস বের হওয়া বা চুলকানি থাকতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ পাইলসে ব্যথা কম হতে পারে।

ফিশারের ক্ষেত্রে সাধারণত শক্ত মলত্যাগের পর তীব্র কাটার মতো ব্যথা ও জ্বালাপোড়ার সঙ্গে অল্প রক্তপাত হতে পারে।

তবে শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিত রোগ নির্ণয় সবসময় সম্ভব নয়।

কখন পাইলস থেকে রক্ত পড়লে দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—

  • প্রচুর পরিমাণে রক্তপাত
  • বারবার রক্ত পড়া
  • মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা
  • কালো বা আলকাতরার মতো মল
  • তীব্র পায়ুপথের ব্যথা
  • জ্বর
  • পায়ুপথে দ্রুত বাড়তে থাকা ফোলা
  • পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব
  • অকারণে ওজন কমে যাওয়া
  • দীর্ঘদিনের মলাভ্যাসের পরিবর্তন

বিশেষ করে অতিরিক্ত রক্তপাত বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

পাইলস থেকে রক্ত পড়া প্রতিরোধের উপায়

পাইলসের রক্তপাতের ঝুঁকি কমাতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন।

আঁশযুক্ত খাবার খান

শাকসবজি, ফল, ডাল, গোটা শস্য ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার মল নরম রাখতে সাহায্য করে।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়তা করতে পারে।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন

হাঁটা বা নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।

মলত্যাগের সময় চাপ দেবেন না

জোর করে মলত্যাগ করা এড়িয়ে চলুন।

টয়লেটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকবেন না

মলত্যাগ হয়ে গেলে অযথা দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকবেন না।

Dr. Faridul Islam-এর কাছে পাইলস থেকে রক্ত পড়ার চিকিৎসা

Dr. Faridul Islam পাইলস, এনাল ফিশার, এনাল ফিস্টুলা এবং অন্যান্য অ্যানোরেক্টাল সমস্যার চিকিৎসায় রোগীর উপসর্গ ও রোগের অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন।

পাইলস থেকে রক্ত পড়ার ক্ষেত্রে প্রথমে রক্তপাতের কারণ ও পাইলসের ধরন নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর অবস্থার ওপর ভিত্তি করে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ওষুধ, নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা, লেজার বা প্রয়োজনে সার্জিক্যাল চিকিৎসার বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে।

FAQ: পাইলস থেকে রক্ত পড়া

পাইলস থেকে কী ধরনের রক্ত পড়ে?

পাইলসের ক্ষেত্রে সাধারণত উজ্জ্বল লাল রক্ত মলত্যাগের সময় বা পরে দেখা যেতে পারে।

পাইলস থেকে রক্ত পড়লে কি ভয়ের কারণ আছে?

সব রক্তপাত গুরুতর নয়, তবে মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতের কারণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বারবার বা বেশি রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পাইলসের রক্তপাত কি ঘরোয়া চিকিৎসায় বন্ধ হয়?

হালকা উপসর্গ খাদ্যাভ্যাস, পানি পান ও কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে কমতে পারে। তবে বারবার রক্তপাত হলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

পাইলস থেকে রক্ত পড়লে কি অপারেশন করতে হয়?

না। সব রোগীর অপারেশন প্রয়োজন হয় না। রোগের গ্রেড ও তীব্রতার ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে।

লেজারে পাইলসের রক্তপাতের চিকিৎসা করা যায়?

নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে লেজার-ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটি সব রোগীর জন্য উপযুক্ত নয় এবং চিকিৎসক রোগের অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেন।

উপসংহার

পাইলস থেকে রক্ত পড়া অর্শ রোগের একটি সাধারণ লক্ষণ হলেও মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতকে অবহেলা করা উচিত নয়। কোষ্ঠকাঠিন্য, শক্ত মল ও মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ পাইলসের রক্তপাত বাড়াতে পারে।আঁশযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সঠিক টয়লেটের অভ্যাস পাইলসের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। তবে বারবার রক্তপাত, প্রচুর রক্তপাত, তীব্র ব্যথা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।Dr. Faridul Islam রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে পাইলস থেকে রক্ত পড়ার কারণ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে পারেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top