অর্শ রোগ কেন হয়

অর্শ রোগ কেন হয়? | Dr. Faridul Islam

অর্শ রোগ কেন হয়—এই প্রশ্নটি অনেক রোগীর। অর্শ বা পাইলস (Hemorrhoids) হলো মলদ্বার ও মলাশয়ের নিচের অংশের রক্তনালি ও আশপাশের টিস্যু ফুলে যাওয়ার একটি সাধারণ সমস্যা। কোষ্ঠকাঠিন্য, শক্ত মল, মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ এবং দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকার মতো অভ্যাস অর্শের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।অর্শ হওয়ার একাধিক কারণ থাকতে পারে এবং অনেক সময় একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। তাই শুধু একটি কারণকে দায়ী না করে খাদ্যাভ্যাস, মলত্যাগের অভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

অর্শ রোগ কেন হয়?

১. দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য

কোষ্ঠকাঠিন্য অর্শের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। দীর্ঘদিন শক্ত মল হলে মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়। এতে মলদ্বারের রক্তনালির ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং অর্শের সমস্যা তৈরি বা বাড়তে পারে।

২. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া

অনেকেই শক্ত মল বের করার জন্য দীর্ঘ সময় জোর করেন। বারবার এমন হলে মলদ্বারের রক্তনালির ওপর চাপ পড়ে এবং অর্শের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

৩. কম আঁশযুক্ত খাবার

খাবারে পর্যাপ্ত আঁশ না থাকলে মল শক্ত হয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। শাকসবজি, ফল, ডাল ও গোটা শস্যের মতো আঁশযুক্ত খাবার মল নরম রাখতে সাহায্য করে।

৪. পর্যাপ্ত পানি না পান করা

শরীরে পর্যাপ্ত তরল না থাকলে মল শক্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। এর ফলে মলত্যাগে চাপ দিতে হয় এবং অর্শের সমস্যা বাড়তে পারে।

৫. টয়লেটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা

দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকা, বিশেষ করে মলত্যাগের প্রয়োজন শেষ হওয়ার পরও বসে থাকা, মলদ্বারের রক্তনালিতে চাপ বাড়াতে পারে।টয়লেটে বসে মোবাইল ব্যবহার করার অভ্যাস থাকলে তা কমানো ভালো।

৬. দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা

অফিসে বা অন্য কাজে দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকলে শারীরিক কার্যক্রম কমে যায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রবণতা বাড়তে পারে। নিয়মিত হাঁটা ও শারীরিক কার্যক্রম বজায় রাখা উপকারী।

৭. গর্ভাবস্থা

গর্ভাবস্থায় শরীরে বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে পাইলসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জরায়ুর চাপ এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো বিষয় এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

৮. অতিরিক্ত ওজন

অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে পাইলসের ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা সামগ্রিকভাবে হজম ও অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য উপকারী।

৯. ভারী ওজন তোলা

নিয়মিত ভারী ওজন তোলা বা অতিরিক্ত চাপের কাজ করার সময় পেটের ভেতরের চাপ বাড়তে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি পাইলসের উপসর্গকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

১০. দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া

শুধু কোষ্ঠকাঠিন্য নয়, দীর্ঘদিনের ডায়রিয়ার কারণেও বারবার মলত্যাগ ও পায়ুপথে ঘর্ষণের ফলে অর্শের উপসর্গ বাড়তে পারে।

অর্শ রোগের প্রধান লক্ষণ

অর্শের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

  • মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্ত পড়া
  • মলদ্বারে গুটি বা ফোলা
  • পায়ুপথে চুলকানি
  • জ্বালাপোড়া
  • মলদ্বারে ব্যথা বা অস্বস্তি
  • মলদ্বার দিয়ে মাংস বের হওয়া
  • মলত্যাগের পরও চাপ বা অস্বস্তি অনুভব করা

তবে এসব লক্ষণ শুধু অর্শেই হয় না। ফিশার বা অন্যান্য অ্যানোরেক্টাল সমস্যাতেও একই ধরনের উপসর্গ হতে পারে।

অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অর্শ

অভ্যন্তরীণ অর্শ

মলদ্বারের ভেতরে তৈরি হওয়া অর্শকে অভ্যন্তরীণ অর্শ বলা হয়। এর অন্যতম লক্ষণ হলো মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্ত পড়া। রোগ বাড়লে অর্শ মলদ্বারের বাইরে বের হয়ে আসতে পারে।

বাহ্যিক অর্শ

মলদ্বারের বাইরের অংশে তৈরি হওয়া অর্শকে বাহ্যিক অর্শ বলা হয়। এতে গুটি, ফোলা, চুলকানি ও ব্যথা হতে পারে। কখনও রক্ত জমাট বাঁধলে হঠাৎ তীব্র ব্যথাযুক্ত গুটি তৈরি হতে পারে।

অর্শ রোগ কি শুধু কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে হয়?

না। কোষ্ঠকাঠিন্য অর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হলেও এটি একমাত্র কারণ নয়।বয়স, গর্ভাবস্থা, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া, অতিরিক্ত ওজন এবং পারিবারিক বা ব্যক্তিগত প্রবণতাসহ বিভিন্ন বিষয় অর্শের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্শ রোগ প্রতিরোধের উপায়

অর্শের ঝুঁকি কমাতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তন করা যেতে পারে।

আঁশযুক্ত খাবার খান

প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, ডাল ও গোটা শস্য খান।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করুন এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানোর চেষ্টা করুন।

নিয়মিত হাঁটুন

প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা বা শারীরিক কার্যক্রম অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

মল চেপে রাখবেন না

মলত্যাগের চাপ এলে দীর্ঘ সময় ধরে মল আটকে রাখবেন না।

মলত্যাগের সময় জোর করবেন না

অতিরিক্ত চাপ দেওয়া এড়িয়ে চলুন।

টয়লেটে দীর্ঘক্ষণ বসবেন না

মলত্যাগ হয়ে গেলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকবেন না।

অর্শ রোগ হলে কী করবেন?

অর্শের প্রাথমিক উপসর্গ থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি ও আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত হাঁটা উপকারী হতে পারে।

হালকা অস্বস্তির ক্ষেত্রে কুসুম গরম পানিতে কিছুক্ষণ বসে সাময়িক আরাম পাওয়া যেতে পারে।

তবে বারবার রক্তপাত, তীব্র ব্যথা, বড় গুটি বা মলদ্বার দিয়ে মাংস বের হওয়া থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অর্শ রোগের চিকিৎসা

অর্শের চিকিৎসা রোগের ধরন, গ্রেড ও উপসর্গের ওপর নির্ভর করে।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

প্রাথমিক পর্যায়ে আঁশযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।

ওষুধ

উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক ব্যথা, চুলকানি বা প্রদাহ কমানোর জন্য ওষুধ দিতে পারেন।

নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা

নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে Rubber Band Ligation বা Sclerotherapy-এর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।

লেজার চিকিৎসা

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লেজার-ভিত্তিক চিকিৎসা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সব অর্শ রোগীর জন্য লেজার চিকিৎসা উপযুক্ত নয়। রোগের ধরন ও পর্যায় দেখে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

সার্জিক্যাল চিকিৎসা

বড় বা উন্নত পর্যায়ের অর্শের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সার্জিক্যাল চিকিৎসা করা হতে পারে।

কখন অর্শ রোগের জন্য ডাক্তার দেখাবেন?

নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:

  • বারবার মলত্যাগের সময় রক্ত পড়া
  • প্রচুর রক্তপাত
  • তীব্র পায়ুপথের ব্যথা
  • বড় বা শক্ত গুটি
  • মলদ্বার দিয়ে মাংস বের হয়ে থাকা
  • পুঁজ বা স্রাব
  • জ্বর
  • দীর্ঘদিন ধরে উপসর্গ থাকা
  • চিকিৎসার পরেও বারবার সমস্যা হওয়া

মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়লেই সেটিকে অর্শ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজনে অন্য কারণও পরীক্ষা করে দেখা দরকার।

Dr. Faridul Islam-এর কাছে অর্শ রোগের চিকিৎসা

Dr. Faridul Islam পাইলস বা অর্শ, এনাল ফিশার, এনাল ফিস্টুলা এবং অন্যান্য অ্যানোরেক্টাল সমস্যার চিকিৎসায় রোগীর উপসর্গ ও রোগের অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন।অর্শের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমে রোগের ধরন ও পর্যায় নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ। এরপর রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ওষুধ, নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা, লেজার বা প্রয়োজনে সার্জিক্যাল চিকিৎসার বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে।

FAQ: অর্শ রোগ কেন হয়?

অর্শ রোগের প্রধান কারণ কী?

কোষ্ঠকাঠিন্য, শক্ত মল, মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ, দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা এবং কম আঁশযুক্ত খাবার অর্শের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।

বেশি ঝাল খাবার খেলে কি অর্শ হয়?

ঝাল খাবার সরাসরি অর্শের কারণ হিসেবে প্রমাণিত নয়। তবে কারও ক্ষেত্রে ঝাল খাবার পায়ুপথের জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি বাড়াতে পারে।

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে কি অর্শ হয়?

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এবং কম শারীরিক কার্যক্রম পাইলসের ঝুঁকি ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। নিয়মিত হাঁটা উপকারী।

অর্শ কি পুরোপুরি ভালো হয়?

উপসর্গ ও রোগের পর্যায় অনুযায়ী অর্শ কার্যকরভাবে চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। চিকিৎসার পাশাপাশি কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধের অভ্যাস বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

অর্শ হলে কি অপারেশন করতেই হবে?

না। সব রোগীর অপারেশন লাগে না। রোগের পর্যায় অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস, ওষুধ, নন-সার্জিক্যাল পদ্ধতি বা প্রয়োজনে সার্জারি করা হয়।

উপসংহার

অর্শ রোগ কেন হয়—এর একক কোনো কারণ নেই। কোষ্ঠকাঠিন্য, শক্ত মল, মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ, কম আঁশযুক্ত খাবার, দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, গর্ভাবস্থা ও অন্যান্য কারণ অর্শের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।আঁশযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং সঠিক মলত্যাগের অভ্যাস অর্শ প্রতিরোধে সহায়ক। তবে রক্তপাত, তীব্র ব্যথা, গুটি বা মাংস বের হওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।Dr. Faridul Islam রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে অর্শের কারণ ও পর্যায় অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে পারেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top