পাইলসের চিকিৎসা – বা হেমোরয়েড একটি খুব সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি তখন হয় যখন মলদ্বার বা রেকটামের নিচের অংশের শিরাগুলো ফুলে যায় বা স্ফীত হয়ে পড়ে। সাধারণত দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য, বেশি সময় বসে থাকা, গর্ভাবস্থা, অতিরিক্ত ওজন, ভারী জিনিস তোলা বা কম ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়ার কারণে পাইলসের সমস্যা দেখা দেয়।পাইলস হলে মলত্যাগের সময় রক্তপাত, ব্যথা, চুলকানি, জ্বালা, এবং মলদ্বারের কাছে ফুলে যাওয়া বা গুটি দেখা দিতে পারে। অনেকেই লজ্জা বা ভয়ের কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন, কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা নিলে পাইলস সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এই আর্টিকেলে পাইলসের কারণ, লক্ষণ এবং বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।—পাইলস কী?পাইলস হলো মলদ্বারের শিরাগুলো ফুলে যাওয়ার একটি অবস্থা। এটি দুই ধরনের হতে পারে:১. অভ্যন্তরীণ পাইলস (Internal Piles)এটি মলদ্বারের ভেতরে হয়। সাধারণত এতে তেমন ব্যথা হয় না, কিন্তু মলত্যাগের সময় রক্তপাত হতে পারে।২. বাহ্যিক পাইলস (External Piles)এটি মলদ্বারের বাইরের অংশে হয়। এতে ব্যথা, চুলকানি এবং ফোলা অনুভূত হতে পারে।—পাইলসের প্রধান কারণপাইলস হওয়ার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে:দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্যবেশি সময় ধরে টয়লেটে বসে থাকাকম ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়াগর্ভাবস্থাঅতিরিক্ত ওজনভারী জিনিস তোলাদীর্ঘ সময় বসে থাকাএই কারণগুলো মলদ্বারের শিরায় চাপ সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে পাইলসের সমস্যা তৈরি হয়।—পাইলসের লক্ষণপাইলসের লক্ষণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:মলত্যাগের সময় রক্তপাতমলদ্বারে ব্যথা বা জ্বালামলদ্বারের চারপাশে চুলকানিমলদ্বারের পাশে গুটি বা ফোলামলত্যাগের সময় অস্বস্তিযদি এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।—পাইলসের চিকিৎসাপাইলসের চিকিৎসা রোগের অবস্থা এবং তীব্রতার উপর নির্ভর করে।
সাধারণত চিকিৎসা তিনভাবে করা হয়:১. ঘরোয়া চিকিৎসাপাইলসের প্রাথমিক অবস্থায় কিছু ঘরোয়া উপায়ে উপশম পাওয়া যায়।ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া:শাকসবজি, ফলমূল, এবং আঁশযুক্ত খাবার খেলে মল নরম হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমে।পর্যাপ্ত পানি পান করা:প্রতিদিন অন্তত ৮–১০ গ্লাস পানি পান করলে হজম ভালো হয়।গরম পানিতে সিটজ বাথ:গরম পানিতে কয়েক মিনিট বসে থাকলে ব্যথা এবং ফোলা কমে।ব্যায়াম করা:নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করলে হজম ভালো হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমে।—২. ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসাডাক্তার পাইলসের উপসর্গ কমানোর জন্য কিছু ওষুধ দিতে পারেন।যেমন:ব্যথা কমানোর ওষুধঅ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ক্রিমমল নরম করার ওষুধফাইবার সাপ্লিমেন্টএই ওষুধগুলো পাইলসের ব্যথা, চুলকানি এবং ফোলা কমাতে সাহায্য করে।—৩. আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিযদি পাইলস বেশি গুরুতর হয়, তাহলে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
লেজার পাইলস চিকিৎসালেজার চিকিৎসা বর্তমানে খুব জনপ্রিয়। এতে লেজার রশ্মির সাহায্যে পাইলসের ফুলে যাওয়া অংশ কমিয়ে দেওয়া হয়।এর সুবিধা হলো:কম ব্যথাকম রক্তপাতদ্রুত সুস্থ হওয়াহাসপাতালে কম সময় থাকতে হয়—রাবার ব্যান্ড লিগেশনএই পদ্ধতিতে পাইলসের গোড়ায় একটি ছোট রাবার ব্যান্ড লাগানো হয়। এতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে পাইলস শুকিয়ে যায়।এটি সাধারণত ছোট বা মাঝারি পাইলসের জন্য ব্যবহার করা হয়।—স্ক্লেরোথেরাপিএই চিকিৎসায় পাইলসের ভেতরে একটি বিশেষ রাসায়নিক ইনজেকশন দেওয়া হয়। এতে পাইলস ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়।—সার্জারি (অপারেশন)যদি পাইলস খুব বড় বা জটিল হয়ে যায়, তখন অপারেশন করা হতে পারে। এই অপারেশনে পাইলস সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা হয়।বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে অপারেশন অনেকটাই নিরাপদ এবং দ্রুত করা যায়।—পাইলস প্রতিরোধের উপায়পাইলস থেকে বাঁচতে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মেনে চলা জরুরি।১. ফাইবারযুক্ত খাবার বেশি খাওয়াসবজি, ফল এবং গোটা শস্য খেলে হজম ভালো থাকে।২. প্রচুর পানি পান করাএটি কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে।৩. নিয়মিত ব্যায়াম করাব্যায়াম হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে।৪. বেশি সময় বসে না থাকাদীর্ঘ সময় বসে থাকলে পাইলসের ঝুঁকি বাড়ে।৫. মল চেপে না রাখামলত্যাগের চাপ অনুভব করলে দেরি না করে টয়লেটে যাওয়া উচিত।—কখন ডাক্তার দেখানো উচিতযদি নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে:মলত্যাগের সময় বেশি রক্তপাততীব্র ব্যথামলদ্বারে বড় ফোলা বা গুটিদীর্ঘদিন ধরে উপসর্গ থাকাসময়মতো চিকিৎসা নিলে জটিলতা এড়ানো যায়।—উপসংহারপাইলস একটি সাধারণ কিন্তু অস্বস্তিকর রোগ। তবে সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে এটি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
প্রাথমিক অবস্থায় ঘরোয়া উপায় এবং ওষুধে উপশম পাওয়া সম্ভব। কিন্তু গুরুতর হলে আধুনিক চিকিৎসা যেমন লেজার চিকিৎসা বা সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।সুস্থ জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়াম পাইলস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি পাইলসের লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


