পাইলসের লক্ষণ ও চিকিৎসা

পাইলসের লক্ষণ ও চিকিৎসা — পাইলস বা হেমোরয়েড একটি অত্যন্ত সাধারণ রোগ, যা মলদ্বারের শিরা ফুলে যাওয়ার কারণে হয়। বর্তমান সময়ে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, কম পানি পান, এবং অলস জীবনযাপনের কারণে এই সমস্যাটি দিন দিন বাড়ছে। অনেক মানুষ পাইলসের লক্ষণ বুঝতে পারেন না বা লজ্জার কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন।

ফলে রোগটি জটিল আকার ধারণ করে। তাই পাইলসের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।—পাইলস কী?পাইলস হলো মলদ্বারের ভেতরে বা বাইরে থাকা শিরাগুলোর অস্বাভাবিক ফোলা অবস্থা। এটি দুই ধরনের হয়—1. ইন্টারনাল পাইলস (ভেতরের পাইলস) – মলদ্বারের ভিতরে থাকে, সাধারণত ব্যথা কম কিন্তু রক্তপাত হতে পারে।2. এক্সটারনাল পাইলস (বাইরের পাইলস) – মলদ্বারের বাইরে থাকে, ব্যথা ও অস্বস্তি বেশি হয়।—পাইলসের প্রধান লক্ষণপাইলসের লক্ষণ রোগের ধরন ও অবস্থার উপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ নিচে দেওয়া হলো—১. মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়াপাইলসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্ত পড়া। এটি সাধারণত ব্যথাহীন হয়, তবে বারবার হলে শরীরে রক্তশূন্যতা তৈরি করতে পারে।২. মলদ্বারে ব্যথা বা জ্বালাবিশেষ করে এক্সটারনাল পাইলসের ক্ষেত্রে তীব্র ব্যথা, জ্বালা বা অস্বস্তি অনুভূত হয়। দীর্ঘ সময় বসে থাকলে বা মলত্যাগের সময় ব্যথা বেড়ে যায়।৩. মলদ্বারে ফোলা বা গাঁটঅনেক সময় মলদ্বারের বাইরে ছোট গাঁট বা ফোলা দেখা যায়, যা হাত দিয়ে অনুভব করা যায়। এটি স্পর্শ করলে ব্যথা হতে পারে।৪. চুলকানিমলদ্বারের আশেপাশে চুলকানি বা অস্বস্তি পাইলসের একটি সাধারণ লক্ষণ।

এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে রোগীর জন্য খুব বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।৫. মলত্যাগে সমস্যাকিছু ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় অস্বস্তি বা অসম্পূর্ণতার অনুভূতি থাকে। এতে রোগী বারবার টয়লেটে যেতে চান।৬. পাইলস বাইরে বের হয়ে আসাগুরুতর অবস্থায় পাইলস মলদ্বারের বাইরে বের হয়ে আসতে পারে, যা হাত দিয়ে ঢোকাতে হয় বা কখনো নিজে থেকেই ঢুকে যায় না।—পাইলসের কারণপাইলসের পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করে। যেমন—দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্যশক্ত মল ত্যাগদীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকাকম ফাইবারযুক্ত খাবারপর্যাপ্ত পানি না পান করাগর্ভাবস্থাস্থূলতা (অতিরিক্ত ওজন)ভারী কাজ বা ওজন তোলা—পাইলসের চিকিৎসাপাইলসের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধাপ ও তীব্রতার উপর। সাধারণত চিকিৎসা তিনভাবে করা হয়——১. ঘরোয়া চিকিৎসাপ্রাথমিক অবস্থায় কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে পাইলস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়— ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়াশাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ওটস ইত্যাদি মল নম রাখতে সাহায্য করে। প্রচুর পানি পানপ্রতিদিন ৮–১০ গ্লাস পানি পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে যায়।সিটজ বাথগরম পানিতে ১০–১৫ মিনিট বসলে ব্যথা ও ফোলা কমে।

নিয়মিত ব্যায়ামহালকা হাঁটা বা ব্যায়াম হজম ভালো করে এবং পাইলস কমাতে সাহায্য করে।—২. ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসাযদি ঘরোয়া চিকিৎসায় কাজ না হয়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নিতে হয়—ব্যথা কমানোর মলম বা ক্রিমরক্তপাত বন্ধ করার ওষুধমল নরম করার ওষুধ (ল্যাক্সেটিভ)প্রদাহ কমানোর ওষুধ নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া উচিত নয়, এতে সমস্যা বাড়তে পারে।—৩. আধুনিক চিকিৎসা (অপারেশন)যদি পাইলস গুরুতর হয়ে যায়, তখন অপারেশন বা অন্যান্য পদ্ধতি প্রয়োজন হতে পারে— লেজার চিকিৎসাএটি আধুনিক ও কম ব্যথার পদ্ধতি। দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়। ব্যান্ড লিগেশনপাইলসের গোড়ায় ব্যান্ড লাগিয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সার্জারি (অপারেশন)গুরুতর ক্ষেত্রে অপারেশন করে পাইলস সরিয়ে ফেলা হয়।—পাইলস প্রতিরোধের উপায়পাইলস একবার ভালো হলেও আবার হতে পারে। তাই প্রতিরোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ—প্রতিদিন ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়াপর্যাপ্ত পানি পান করানিয়মিত ব্যায়াম করাদীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এড়ানোটয়লেটে বেশি সময় না বসাকোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানো—কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে—বারবার রক্ত পড়াতীব্র ব্যথাপাইলস বাইরে বের হয়ে থাকাওষুধে কাজ না করা—উপসংহারপাইলস একটি সাধারণ কিন্তু কষ্টদায়ক সমস্যা। এর লক্ষণগুলো যেমন—রক্তপাত, ব্যথা, ফোলা, চুলকানি—প্রথম দিকে বুঝতে পারলে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সঠিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত জীবনযাপনের মাধ্যমে পাইলস সম্পূর্ণ ভালো হওয়া সম্ভব।তাই লজ্জা বা ভয় না পেয়ে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা এবং সঠিক যত্নই পারে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top