পাইলসের লক্ষণ | Dr. Faridul Islam
পাইলস কী?
পাইলস (Piles) বা হেমোরয়েড (Hemorrhoids) হলো মলদ্বার ও মলাশয়ের নিচের অংশের রক্তনালি এবং আশপাশের টিস্যু ফুলে যাওয়ার একটি সাধারণ সমস্যা। নারী ও পুরুষ উভয়েরই পাইলস হতে পারে। দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য, শক্ত মল, মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার মতো বিষয়গুলো পাইলসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।পাইলসের লক্ষণ রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কারও শুধু মলত্যাগের সময় রক্ত পড়ে, আবার কারও মলদ্বারে গুটি, ব্যথা, চুলকানি বা মাংস বের হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পাইলসের প্রধান লক্ষণ
১. পায়খানার সময় রক্ত পড়া
পাইলসের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হলো মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্ত পড়া। টয়লেট পেপার, কমোড বা মলের গায়ে রক্ত দেখা যেতে পারে।বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ পাইলসের ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় রক্তপাত হতে পারে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যথা নাও থাকতে পারে।তবে মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়া মানেই পাইলস নয়। এনাল ফিশারসহ অন্যান্য রোগেও রক্তপাত হতে পারে। তাই বারবার রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
২. মলদ্বারে গুটি বা ফোলা
পাইলসের আরেকটি সাধারণ লক্ষণ হলো মলদ্বারের পাশে গুটি বা ফোলা অনুভূত হওয়া।
বাহ্যিক পাইলসের ক্ষেত্রে গুটি বাইরে থেকে অনুভব করা যেতে পারে। কখনও রক্ত জমাট বাঁধলে গুটি শক্ত ও ব্যথাযুক্ত হতে পারে।
৩. মলদ্বারে চুলকানি
পাইলসের কারণে মলদ্বারের আশপাশে চুলকানি হতে পারে। মলত্যাগের পর পরিষ্কার করার সময় অতিরিক্ত ঘষাঘষি করলে চুলকানি ও ত্বকের অস্বস্তি আরও বেড়ে যেতে পারে।
৪. মলদ্বারে ব্যথা
সব ধরনের পাইলসে তীব্র ব্যথা হয় না। তবে বাহ্যিক পাইলস বা রক্ত জমাট বাঁধা পাইলসের ক্ষেত্রে ব্যথা হতে পারে।
বসা, হাঁটা বা মলত্যাগের সময় অস্বস্তি বাড়তে পারে।
তবে তীব্র পায়ুপথের ব্যথার অন্য কারণও থাকতে পারে, যেমন এনাল ফিশার বা অ্যাবসেস।
৫. মলদ্বার দিয়ে মাংস বের হওয়া
অভ্যন্তরীণ পাইলস বড় হলে মলত্যাগের সময় মলদ্বার দিয়ে মাংসের মতো অংশ বেরিয়ে আসতে পারে।
প্রাথমিক অবস্থায় এটি মলত্যাগের পর নিজে নিজে ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। রোগের মাত্রা বাড়লে হাত দিয়ে ভেতরে ঢোকাতে হতে পারে। আরও উন্নত পর্যায়ে এটি সবসময় বাইরে থাকতে পারে।
৬. মলত্যাগের পরও অস্বস্তি
পাইলসের কারণে মলত্যাগের পরও মনে হতে পারে যে মল পুরোপুরি বের হয়নি। মলদ্বারে চাপ, ভারী লাগা বা অস্বস্তির অনুভূতি থাকতে পারে।
অভ্যন্তরীণ পাইলসের লক্ষণ
অভ্যন্তরীণ পাইলস মলদ্বারের ভেতরে তৈরি হয়। এর সাধারণ লক্ষণ হলো—
- মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্ত
- মলদ্বার দিয়ে মাংস বের হওয়া
- মলত্যাগের পর অস্বস্তি
- মলদ্বারে চাপ অনুভব করা
প্রাথমিক পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ পাইলসে সাধারণত তীব্র ব্যথা নাও থাকতে পারে।
বাহ্যিক পাইলসের লক্ষণ
বাহ্যিক পাইলস মলদ্বারের বাইরের অংশে হয়। এর ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে—
- মলদ্বারে গুটি
- ফোলা
- ব্যথা
- চুলকানি
- বসতে অস্বস্তি
রক্ত জমাট বাঁধলে হঠাৎ তীব্র ব্যথা ও শক্ত গুটি তৈরি হতে পারে।
পাইলসের পর্যায় বা গ্রেড
অভ্যন্তরীণ পাইলসকে সাধারণত চারটি গ্রেডে ভাগ করা হয়।
গ্রেড ১
পাইলস মলদ্বারের ভেতরে থাকে। বাইরে বের হয় না। মলত্যাগের সময় রক্তপাত হতে পারে।
গ্রেড ২
মলত্যাগের সময় পাইলস বাইরে বের হতে পারে, কিন্তু পরে নিজে নিজে ভেতরে চলে যায়।
গ্রেড ৩
মলত্যাগের সময় পাইলস বাইরে বের হয়ে আসে এবং নিজে থেকে ভেতরে না ঢুকলে হাত দিয়ে ভেতরে ঢোকাতে হতে পারে।
গ্রেড ৪
পাইলস সবসময় বাইরে থাকতে পারে এবং সহজে ভেতরে ঢোকানো যায় না।
পাইলসের গ্রেড অনুযায়ী চিকিৎসার ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।
পাইলস কেন হয়?
পাইলসের সঙ্গে বিভিন্ন কারণ ও অভ্যাসের সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন—
- দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য
- শক্ত মল
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ
- কম আঁশযুক্ত খাবার
- পর্যাপ্ত পানি না পান করা
- দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা
- দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকা
- অতিরিক্ত ওজন
- গর্ভাবস্থা
- ভারী ওজন তোলা
পাইলসের লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন?
প্রথমে কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং শাকসবজি, ফল, ডাল ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার খান।
মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না এবং টয়লেটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকবেন না।
হালকা অস্বস্তির ক্ষেত্রে কুসুম গরম পানিতে কিছুক্ষণ বসে থাকলে সাময়িক আরাম পাওয়া যেতে পারে।
তবে বারবার রক্তপাত, মলদ্বারে গুটি বা মাংস বের হওয়া, তীব্র ব্যথা কিংবা দীর্ঘদিনের সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পাইলসের চিকিৎসা
পাইলসের চিকিৎসা রোগের ধরন ও গ্রেডের ওপর নির্ভর করে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন
প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসক পরামর্শ দিতে পারেন—
- আঁশযুক্ত খাবার বাড়ানো
- পর্যাপ্ত পানি পান
- নিয়মিত ব্যায়াম
- কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া
ওষুধ
উপসর্গ অনুযায়ী ব্যথা, চুলকানি বা প্রদাহ কমানোর জন্য চিকিৎসক ওষুধ দিতে পারেন।
নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা
নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে Rubber Band Ligation, Sclerotherapy বা অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে।
লেজার চিকিৎসা
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লেজার-ভিত্তিক চিকিৎসা বিবেচনা করা হতে পারে। তবে সব পাইলস রোগীর জন্য লেজার উপযুক্ত নয়। রোগের ধরন ও গ্রেড দেখে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
সার্জিক্যাল চিকিৎসা
বড়, জটিল বা উন্নত পর্যায়ের পাইলসের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
কখন পাইলসের জন্য ডাক্তার দেখাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
- বারবার মলত্যাগের সময় রক্ত পড়া
- প্রচুর রক্তপাত
- মলদ্বারে তীব্র ব্যথা
- বড় বা ব্যথাযুক্ত গুটি
- মলদ্বার দিয়ে মাংস বের হয়ে থাকা
- পুঁজ বা জ্বর
- দীর্ঘদিন ধরে উপসর্গ থাকা
- চিকিৎসার পরও সমস্যা বারবার হওয়া
বিশেষ করে মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়লে শুধু পাইলস ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে অন্য কারণগুলোও পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
পাইলস প্রতিরোধের উপায়
পাইলসের ঝুঁকি কমাতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করুন—
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন
- নিয়মিত আঁশযুক্ত খাবার খান
- প্রতিদিন হাঁটা বা ব্যায়াম করুন
- কোষ্ঠকাঠিন্য এড়িয়ে চলুন
- মল চেপে রাখবেন না
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না
- টয়লেটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকবেন না
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
Dr. Faridul Islam-এর কাছে পাইলসের চিকিৎসা
Dr. Faridul Islam পাইলস, এনাল ফিশার, এনাল ফিস্টুলা এবং অন্যান্য অ্যানোরেক্টাল সমস্যার চিকিৎসায় রোগীর উপসর্গ ও রোগের অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন।
পাইলসের চিকিৎসার আগে রোগের ধরন ও পর্যায় নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ। এরপর রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ওষুধ, নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা, লেজার বা সার্জিক্যাল চিকিৎসার বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে।
FAQ: পাইলসের লক্ষণ
পাইলসের প্রথম লক্ষণ কী?
মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্ত পড়া অভ্যন্তরীণ পাইলসের একটি সাধারণ প্রাথমিক লক্ষণ। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই উপসর্গ দেখা যায় না।
পাইলস হলে কি মলদ্বারে গুটি হয়?
হ্যাঁ। বিশেষ করে বাহ্যিক পাইলসের ক্ষেত্রে মলদ্বারের বাইরে গুটি বা ফোলা দেখা যেতে পারে।
পাইলসের কারণে কি মাংস বের হয়?
উন্নত অভ্যন্তরীণ পাইলস মলত্যাগের সময় মলদ্বার দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে।
পাইলস হলে কি সবসময় ব্যথা হয়?
না। অভ্যন্তরীণ পাইলসের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যথা নাও থাকতে পারে। বাহ্যিক পাইলস বা রক্ত জমাট বাঁধলে ব্যথা বেশি হতে পারে।
পাইলসের লক্ষণ থাকলে কি অপারেশন লাগবে?
না। সব রোগীর অপারেশন প্রয়োজন হয় না। রোগের গ্রেড ও তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে ওষুধ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নন-সার্জিক্যাল পদ্ধতি বা প্রয়োজনে সার্জারি করা হয়।
উপসংহার
পাইলসের লক্ষণ হিসেবে মলত্যাগের সময় রক্ত পড়া, মলদ্বারে গুটি বা ফোলা, চুলকানি, ব্যথা, জ্বালাপোড়া এবং মলদ্বার দিয়ে মাংস বের হওয়া দেখা যেতে পারে। তবে এসব উপসর্গ অন্যান্য অ্যানোরেক্টাল রোগেও হতে পারে।তাই বারবার রক্তপাত, তীব্র ব্যথা, গুটি বা মাংস বের হওয়ার মতো সমস্যা হলে নিজে থেকে চিকিৎসা না করে একজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।Dr. Faridul Islam রোগীর উপসর্গ ও রোগের পর্যায় মূল্যায়ন করে পাইলসের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে পারেন।


