পাইলস হলে কী করবেন?
পাইলস বা অর্শ মলদ্বারের একটি পরিচিত সমস্যা। এ রোগে মলদ্বারের ভেতরে বা চারপাশের রক্তনালি-সমৃদ্ধ টিস্যু ফুলে যেতে পারে। ফলে পায়খানার সময় রক্ত পড়া, মলদ্বারে ব্যথা, চুলকানি, ফোলা বা গুটি অনুভব হতে পারে। অনেকেই পাইলসের লক্ষণ দেখা দিলে চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং জানতে চান, পাইলস হলে কী করবেন।
পাইলস হলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে লক্ষণগুলো খেয়াল করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ ও কিছু ঘরোয়া যত্নে উপসর্গ কমতে পারে। তবে সব ধরনের পাইলস ঘরোয়া পদ্ধতিতে ভালো হয় না। সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন, পর্যায় এবং উপসর্গের ওপর।
পাইলস হলে প্রথমে কী করবেন?
পাইলসের মতো লক্ষণ দেখা দিলে নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে পারেন।
১. কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ করুন
কোষ্ঠকাঠিন্য হলে মল শক্ত হয়ে যায় এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়। এতে পাইলসের উপসর্গ বাড়তে পারে। প্রতিদিন আঁশযুক্ত খাবার খান এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ফাইবার সাপ্লিমেন্ট বা মল নরম করার ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
২. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না
পায়খানার সময় জোর করে মলত্যাগ করা এড়িয়ে চলুন। মলত্যাগের চাপ এলে তা দীর্ঘ সময় আটকে রাখবেন না। টয়লেটে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় বসে থাকাও ঠিক নয়।
৩. কুসুম গরম পানিতে বসুন
মলদ্বারে ব্যথা, চুলকানি বা অস্বস্তি থাকলে পরিষ্কার পাত্রে কুসুম গরম পানিতে ১০–১৫ মিনিট বসে থাকতে পারেন। এতে সাময়িক আরাম মিলতে পারে। পানি অতিরিক্ত গরম করবেন না। এই পদ্ধতি উপসর্গ কমাতে সাহায্য করলেও এটি সব ধরনের পাইলস সারানোর চিকিৎসা নয়।
৪. স্বাস্থ্যকর খাবার খান
প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, ওটস ও পূর্ণ শস্য রাখুন। আঁশযুক্ত খাবার মল নরম রাখতে সাহায্য করে এবং মলত্যাগের সময় চাপ কমাতে পারে। আঁশ ধীরে ধীরে বাড়ান এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন, যদি চিকিৎসক পানি সীমিত রাখতে না বলেন।
৫. নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করুন
হাঁটাহাঁটি ও হালকা শারীরিক ব্যায়াম অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে। দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন। ব্যথা বেশি থাকলে নিজের অবস্থা অনুযায়ী শারীরিক কাজ করুন।
পাইলসের লক্ষণ কী কী?
পাইলসের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- পায়খানার সময় বা পরে উজ্জ্বল লাল রক্ত পড়া।
- মলদ্বারে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া।
- মলদ্বারের চারপাশে ফোলা বা গুটি অনুভব করা।
- মলত্যাগের সময় ব্যথা বা অস্বস্তি।
- পায়খানার সময় মাংসপিণ্ডের মতো টিস্যু বাইরে বেরিয়ে আসা।
- মলত্যাগের পরও অস্বস্তি থাকা।
মলদ্বারে রক্তপাত হলেই পাইলস হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অ্যানাল ফিশার, অন্ত্রের প্রদাহ, পলিপসহ অন্যান্য রোগেও রক্তপাত হতে পারে। তাই সঠিক রোগ নির্ণয় জরুরি।
পাইলস হলে কী চিকিৎসা নিতে হবে?
পাইলসের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের পর্যায়, উপসর্গ এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।
১. ওষুধ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন
প্রাথমিক পর্যায়ে আঁশযুক্ত খাবার, কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ এবং উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধে উপকার পাওয়া যেতে পারে। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যথা বা চুলকানি কমানোর ওষুধ দিতে পারেন। তবে নিজে থেকে দীর্ঘদিন মলদ্বারে লাগানোর ক্রিম বা স্টেরয়েডযুক্ত ওষুধ ব্যবহার করবেন না।
২. রাবার ব্যান্ড লাইগেশন
এটি অভ্যন্তরীণ পাইলসের একটি প্রচলিত নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা। বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পাইলসের গোড়ায় ছোট রাবার ব্যান্ড লাগানো হয়। এতে রক্ত সরবরাহ কমে যায় এবং টিস্যু ধীরে ধীরে শুকিয়ে ঝরে পড়ে। নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি উপযোগী হতে পারে।
৩. লেজার পাইলস চিকিৎসা
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাইলসের চিকিৎসা করা হয়। তবে লেজার সব রোগীর জন্য সেরা পদ্ধতি নয়। চিকিৎসার সুবিধা, ঝুঁকি, খরচ ও বিকল্প সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
৪. পাইলস অপারেশন
পাইলস বড় হলে, বারবার রক্তপাত হলে, টিস্যু বাইরে বেরিয়ে থেকে সমস্যা তৈরি করলে অথবা অন্যান্য চিকিৎসায় উপকার না হলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে তা পরীক্ষা করে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
পাইলস হলে কোন কাজগুলো করবেন না?
পাইলসের উপসর্গ থাকলে কয়েকটি বিষয় এড়িয়ে চলুন:
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া।
- দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকা।
- মলদ্বারের গুটি নিজে থেকে কাটা, চেপে ধরা বা ফাটানোর চেষ্টা করা।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ওষুধ ব্যবহার করা।
- রক্তপাতকে নিশ্চিতভাবে পাইলস ধরে নিয়ে পরীক্ষা না করানো।
- দীর্ঘদিন উপসর্গ থাকলেও চিকিৎসা নিতে দেরি করা।
পাইলস প্রতিরোধে কী করবেন?
পাইলসের উপসর্গ কমানো এবং পুনরায় সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখা জরুরি।
১. প্রতিদিন আঁশযুক্ত খাবার খান।
২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন, যদি পানি সীমিত রাখার নির্দেশ না থাকে।
৩. নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম করুন।
৪. কোষ্ঠকাঠিন্য হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৫. পায়খানার চাপ এলে দীর্ঘ সময় আটকে রাখবেন না।
৬. টয়লেটে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না।
৭. মলদ্বারে রক্তপাত হলে অবহেলা করবেন না।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
- পায়খানার সঙ্গে বারবার রক্ত পড়া।
- মলদ্বারে তীব্র ব্যথা বা নতুন গুটি তৈরি হওয়া।
- মলদ্বার থেকে টিস্যু বেরিয়ে আসা।
- উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকা বা ক্রমে বেড়ে যাওয়া।
- মলদ্বারে পুঁজ, জ্বর বা ক্রমবর্ধমান ফোলা দেখা দেওয়া।
প্রচুর রক্তপাত, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি বা কালো আলকাতরার মতো মল হলে জরুরি চিকিৎসা নিন।
ডা. ফরিদুল ইসলামের পরামর্শে পাইলসের চিকিৎসা
পাইলসের লক্ষণ দেখা দিলে সঠিক রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। ডা. ফরিদুল ইসলামের কাছে পরামর্শ নেওয়ার কথা বিবেচনা করলে তাঁর বর্তমান যোগ্যতা, চেম্বারের ঠিকানা এবং অ্যাপয়েন্টমেন্টের তথ্য সরাসরি যাচাই করে নিন।
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় কত দিন ধরে সমস্যা হচ্ছে, রক্তপাত বা ব্যথা আছে কি না, কোষ্ঠকাঠিন্য হচ্ছে কি না এবং আগে কোনো চিকিৎসা নিয়েছেন কি না—এসব তথ্য জানালে মূল্যায়নে সুবিধা হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. পাইলস হলে প্রথমে কী করবেন?
আঁশযুক্ত খাবার খান, পর্যাপ্ত পানি পান করুন, কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ করুন এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না। রক্তপাত বা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
২. পাইলস কি ঘরোয়া চিকিৎসায় ভালো হয়?
প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু রোগীর উপসর্গ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও ঘরোয়া যত্নে কমতে পারে। তবে সব ধরনের পাইলসের জন্য এই পদ্ধতি যথেষ্ট নয়।
৩. পাইলস হলে কি অপারেশন করতেই হবে?
না। অনেক রোগীর অপারেশন ছাড়াই চিকিৎসা সম্ভব। তবে পাইলসের পর্যায় ও উপসর্গ অনুযায়ী কিছু রোগীর বিশেষ চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে।
৪. পাইলস হলে রক্ত পড়া কি বিপজ্জনক?
রক্তপাত পাইলসের কারণে হতে পারে, কিন্তু অন্য রোগের কারণেও হতে পারে। তাই রক্তপাত বারবার হলে বা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৫. পাইলসের ব্যথা কমানোর উপায় কী?
কুসুম গরম পানিতে বসা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে উপকার হতে পারে। ব্যথা তীব্র হলে বা নতুন গুটি তৈরি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
উপসংহার
পাইলস হলে আতঙ্কিত না হয়ে উপসর্গগুলো খেয়াল করুন এবং কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিন। আঁশযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি ও সঠিক টয়লেটের অভ্যাস উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে মলদ্বারে রক্তপাত, তীব্র ব্যথা বা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলে নিজে নিজে চিকিৎসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক রোগ নির্ণয়ই উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়ার প্রথম ধাপ।


