মলদ্বারে বারবার ফোড়া হওয়ার কারণ | Dr. Faridul Islam
মলদ্বারে বারবার ফোড়া হওয়ার কারণ জানতে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আগে অনলাইনে তথ্য খোঁজেন। মলদ্বারের পাশে ফোড়া, ফোলা, ব্যথা এবং পুঁজ জমা হওয়া বেশ অস্বস্তিকর একটি সমস্যা। অনেক সময় ফোড়া ফেটে পুঁজ বের হয়ে গেলে ব্যথা কমে যায় এবং রোগী মনে করেন সমস্যা সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে একই জায়গায় বারবার ফোড়া হওয়া একটি অন্তর্নিহিত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।বিশেষ করে মলদ্বারে বারবার অ্যাবসেস বা ফোড়া হলে অ্যানাল ফিস্টুলা থাকার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হয়। তাই বারবার একই ধরনের সমস্যা হলে শুধু ফোড়ার চিকিৎসা না করে এর কারণ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।
মলদ্বারের ফোড়া কী?
মলদ্বারের আশপাশে পুঁজ জমে তৈরি হওয়া সংক্রমিত ফোলা বা গর্তকে সাধারণভাবে মলদ্বারের ফোড়া বলা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে Perianal বা Anorectal Abscess বলা হয়।
মলদ্বারের ভেতরের ছোট গ্রন্থিতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে পুঁজ জমে অ্যাবসেস তৈরি হতে পারে। ফোড়া বড় হলে ব্যথা, ফোলা ও জ্বর হতে পারে।
মলদ্বারে বারবার ফোড়া হওয়ার প্রধান কারণ
১. অ্যানাল ফিস্টুলা
বারবার একই জায়গায় ফোড়া হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অ্যানাল ফিস্টুলা।
একটি অ্যাবসেস হওয়ার পর সেটি ফেটে পুঁজ বের হয়ে গেলেও যদি ভেতরে একটি অস্বাভাবিক নালী থেকে যায়, সেটি ফিস্টুলায় পরিণত হতে পারে। এই নালী দিয়ে সংক্রমণ হলে আবার পুঁজ জমে ফোড়া হতে পারে।
তাই বারবার ফোড়া হওয়ার সঙ্গে যদি মলদ্বারের পাশে ছোট গর্ত এবং পুঁজ বা স্রাব বের হওয়ার সমস্যা থাকে, তাহলে ফিস্টুলার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা জরুরি।
২. মলদ্বারের গ্রন্থিতে সংক্রমণ
মলদ্বারের ভেতরে থাকা ছোট গ্রন্থিতে সংক্রমণ হলে পুঁজ জমে অ্যাবসেস তৈরি হতে পারে।
একবার চিকিৎসার পরও যদি সংক্রমণের উৎস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ না হয়, তাহলে পুনরায় ফোড়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।
৩. ফোড়া অসম্পূর্ণভাবে চিকিৎসা হওয়া
ফোড়ার ভেতরে পুঁজ থেকে গেলে বা drainage যথেষ্ট না হলে সংক্রমণ পুনরায় দেখা দিতে পারে।
শুধু বাইরে থেকে পুঁজ বের হওয়াই সবসময় সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান নয়। ভেতরে ফিস্টুলার নালী বা অন্য কোনো সংক্রমণের উৎস থাকলে সেটির চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
৪. Crohn’s disease
Crohn’s disease একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি মলদ্বারের আশপাশে ফিস্টুলা ও অ্যাবসেসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
বারবার অ্যানাল অ্যাবসেস বা ফিস্টুলার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া, পেট ব্যথা, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি থাকলে চিকিৎসক অতিরিক্ত পরীক্ষা বিবেচনা করতে পারেন।
৫. কিছু দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ
কিছু দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণও অ্যানোরেক্টাল অঞ্চলে ফোড়া বা ফিস্টুলার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। রোগীর ইতিহাস ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন।
মলদ্বারের ফোড়ার লক্ষণ
মলদ্বারের ফোড়ায় সাধারণত দেখা যেতে পারে:
- মলদ্বারের পাশে ব্যথাযুক্ত ফোলা
- তীব্র বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা ব্যথা
- বসতে গেলে ব্যথা
- মলত্যাগের সময় ব্যথা বা চাপ
- পুঁজ জমা হওয়া
- ত্বক লাল বা গরম হয়ে যাওয়া
- জ্বর
- শরীর দুর্বল বা অসুস্থ লাগা
ফোড়া নিজে থেকে ফেটে গেলে পুঁজ বের হতে পারে এবং ব্যথা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে।
ফোড়া বারবার হলে ফিস্টুলা কীভাবে বুঝবেন?
নিচের লক্ষণগুলো থাকলে ফিস্টুলার সম্ভাবনা বিবেচনা করা উচিত:
- একই জায়গায় বারবার ফোড়া হওয়া
- মলদ্বারের পাশে ছোট গর্ত থাকা
- গর্ত দিয়ে পুঁজ বা স্রাব বের হওয়া
- ক্ষত শুকিয়ে আবার পুঁজ হওয়া
- দীর্ঘদিন ধরে দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব
- ফোড়া ফেটে যাওয়ার পরও একই জায়গায় সমস্যা হওয়া
এসব লক্ষণ থাকলে কোলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
মলদ্বারের ফোড়া কি ঘরোয়া চিকিৎসায় ভালো হয়?
ছোটখাটো ত্বকের ফোঁড়ার সঙ্গে মলদ্বারের অ্যাবসেসকে এক করে দেখা ঠিক নয়। অ্যানোরেক্টাল অ্যাবসেস হলে ভেতরে পুঁজ জমে থাকতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মাধ্যমে drainage প্রয়োজন হয়।
গরম পানিতে বসে থাকা বা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কিছুটা আরাম দিতে পারে, কিন্তু এগুলো অ্যাবসেসের মূল চিকিৎসার বিকল্প নয়।
ফোড়া চেপে নিজে পুঁজ বের করার চেষ্টা করা উচিত নয়।
মলদ্বারের ফোড়ার চিকিৎসা
অ্যানাল অ্যাবসেসের চিকিৎসা রোগীর অবস্থা ও ফোড়ার অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার মূল বিষয় হলো পুঁজ বের করে দেওয়া (drainage)।
অ্যান্টিবায়োটিক কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু শুধু অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সব অ্যাবসেসের চিকিৎসা করা যায় না।
যদি ফোড়ার পেছনে ফিস্টুলা থাকে, তাহলে ফিস্টুলার জন্য আলাদা চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
ফিস্টুলা থাকলে কী চিকিৎসা করা হয়?
ফিস্টুলার ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা পরিবর্তিত হয়। সম্ভাব্য পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে:
- Fistulotomy
- Seton placement
- LIFT procedure
- Advancement flap
- নির্বাচিত ক্ষেত্রে লেজার-ভিত্তিক চিকিৎসা
কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে তা ফিস্টুলার নালী, অবস্থান এবং স্ফিঙ্কটার পেশির সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে।
কখন MRI করা হয়?
সব রোগীর MRI প্রয়োজন হয় না। তবে জটিল, গভীর, পুনরায় হওয়া বা একাধিক শাখাযুক্ত ফিস্টুলার ক্ষেত্রে চিকিৎসক MRI pelvis বিবেচনা করতে পারেন।
MRI-এর মাধ্যমে ফিস্টুলার নালী ও তার শাখা এবং স্ফিঙ্কটার পেশির সঙ্গে সম্পর্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
মলদ্বারে বারবার ফোড়া হওয়া প্রতিরোধের উপায়
ফোড়ার সব কারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাস উপকারী হতে পারে:
কোষ্ঠকাঠিন্য এড়িয়ে চলুন
আঁশযুক্ত খাবার ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ করুন।
পায়ুপথ পরিষ্কার রাখুন
মলত্যাগের পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
ফোড়া চেপে ধরবেন না
নিজে চাপ দিয়ে পুঁজ বের করার চেষ্টা করলে সংক্রমণ ছড়াতে পারে বা ক্ষত আরও খারাপ হতে পারে।
বারবার হলে কারণ খুঁজুন
একই জায়গায় বারবার ফোড়া হলে শুধু প্রতিবার ফোড়ার চিকিৎসা না করে ফিস্টুলা বা অন্য কোনো কারণ আছে কি না তা পরীক্ষা করা উচিত।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
- তীব্র পায়ুপথের ব্যথা
- দ্রুত ফোলা বৃদ্ধি
- জ্বর বা কাঁপুনি
- প্রচুর পুঁজ
- বসতে বা হাঁটতে খুব কষ্ট হওয়া
- মলত্যাগের সময় তীব্র ব্যথা
- একই জায়গায় বারবার ফোড়া হওয়া
- মলদ্বারের পাশে স্থায়ী গর্ত বা স্রাব
বিশেষ করে তীব্র ব্যথা + ফোলা + জ্বর থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ফিস্টুলা ও ফোড়ার মধ্যে পার্থক্য
ফোড়া হলো সাধারণত সংক্রমণের কারণে পুঁজ জমে তৈরি হওয়া একটি ফোলা। অন্যদিকে ফিস্টুলা হলো মলদ্বারের ভেতর থেকে বাইরের ত্বক পর্যন্ত তৈরি হওয়া একটি অস্বাভাবিক নালী।
একটি ফোড়ার পর ফিস্টুলা তৈরি হতে পারে। তাই ফোড়া বারবার হলে ফিস্টুলার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
মলদ্বারে বারবার ফোড়া হলে কোন ডাক্তার দেখাবেন?
মলদ্বারে বারবার ফোড়া, পুঁজ বা গর্ত হলে কোলোরেক্টাল সার্জন (Colorectal Surgeon) অথবা অ্যানোরেক্টাল রোগে অভিজ্ঞ সার্জনের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষজ্ঞ রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা করে প্রয়োজনে অতিরিক্ত পরীক্ষা নির্ধারণ করতে পারেন।
Dr. Faridul Islam-এর কাছে চিকিৎসা
Dr. Faridul Islam ফিস্টুলা, পাইলস, এনাল ফিশার ও অন্যান্য অ্যানোরেক্টাল সমস্যার ক্ষেত্রে রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে পারেন।
মলদ্বারে বারবার ফোড়া হলে শুধু ফোড়ার চিকিৎসা নয়, এর পেছনে ফিস্টুলা বা অন্য কোনো কারণ আছে কি না সেটিও মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
FAQ: মলদ্বারে বারবার ফোড়া হওয়ার কারণ
মলদ্বারে বারবার ফোড়া কেন হয়?
অ্যানাল ফিস্টুলা, মলদ্বারের গ্রন্থিতে বারবার সংক্রমণ, অসম্পূর্ণ drainage এবং কিছু প্রদাহজনিত বা দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে বারবার ফোড়া হতে পারে।
বারবার ফোড়া হলে কি ফিস্টুলা হতে পারে?
হ্যাঁ। একই জায়গায় বারবার অ্যাবসেস হওয়া অ্যানাল ফিস্টুলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে।
ফোড়া ফেটে পুঁজ বের হলে কি সমস্যা শেষ?
সবসময় নয়। পুঁজ বের হয়ে ব্যথা কমলেও ভেতরে ফিস্টুলার নালী থেকে যেতে পারে এবং পরে আবার ফোড়া হতে পারে।
মলদ্বারের ফোড়া কি ওষুধে ভালো হয়?
কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু পুঁজ জমে থাকা অ্যাবসেসের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মাধ্যমে drainage প্রয়োজন হতে পারে।
মলদ্বারে বারবার ফোড়া হলে কোন ডাক্তার দেখাব?
কোলোরেক্টাল সার্জন বা অ্যানোরেক্টাল রোগে অভিজ্ঞ সার্জনের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
উপসংহার
মলদ্বারে বারবার ফোড়া হওয়ার কারণ খুঁজে বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই জায়গায় বারবার ফোড়া, পুঁজ বা স্রাব বের হওয়া এবং মলদ্বারের পাশে গর্ত থাকলে অ্যানাল ফিস্টুলার সম্ভাবনা থাকতে পারে।শুধু ফোড়া ফেটে পুঁজ বের হওয়া বা সাময়িকভাবে ব্যথা কমে যাওয়াকে সম্পূর্ণ সুস্থতা মনে করা উচিত নয়। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণ বা চিকিৎসা করা সম্ভব।তাই মলদ্বারে বারবার ফোড়া হলে দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ কোলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ নিন।Dr. Faridul Islam রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে পারেন।


